আইইএর পূর্বাভাস

অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে সরবরাহ চাপ বাড়ছে

চলতি বছর অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে সরবরাহ বাড়তে যাচ্ছে প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুতগতিতে।

চলতি বছর অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে সরবরাহ বাড়তে যাচ্ছে প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুতগতিতে। পণ্যটির উত্তোলন বাড়ানোর মাধ্যমে বাজারে এর সরবরাহ বাড়িয়ে তুলছে ওপেক প্লাস জোটভুক্ত দেশগুলো। জোট-বহির্ভূত উত্তোলনকারী দেশগুলোও এখন একই পথে হাঁটছে। এতে অতিরিক্ত সরবরাহ চাপের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে জ্বালানি পণ্যটির বাজার। একই ধারা বজায় রেখে ২০২৬ সালে আরো বাড়তে পারে পণ্যটির উদ্বৃত্ত।

ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) গতকাল প্রকাশিত নিয়মিত মাসিক প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দৈনিক সরবরাহ বাড়তে যাচ্ছে ২৭ লাখ ব্যারেল। এর আগের পূর্বাভাসে তা ২৫ লাখ ব্যারেল হতে পারে বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি। আইইএর হিসাবে, ২০২৬ সালে পণ্যটির দৈনিক গড় সরবরাহ বাড়তে পারে আরো ২১ লাখ ব্যারেল।

এর আগে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমিয়ে আনছিল ওপেক প্লাস। তবে এ পদক্ষেপ গ্রহণকালে নির্ধারিত সময়ের আগেই চলতি সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে দ্বিতীয় দফায় উত্তোলন বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে ওপেক ভুক্ত দেশগুলো, রাশিয়া ও তাদের মিত্রদের নিয়ে গঠিত জোট। পূর্বনির্ধারিত সময়ের আগেই উত্তোলন বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত বাজারে সরবরাহ চাপকে বাড়িয়ে তুলতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা আইইএর। এরই মধ্যে পণ্যটির দামে এ সরবরাহ চাপ প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

আইইএর হিসাবে চলতি বছর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দৈনিক গড় চাহিদা বাড়তে যাচ্ছে গত বছরের তুলনায় ৭ লাখ ৪০ ব্যারেল। আগের পূর্বাভাসের তুলনায় চলতি বছরের এ অতিরিক্ত চাহিদার সম্ভাব্য পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে ৬০ হাজার ব্যারেল। এ সংশোধনের পেছনে মূলত উন্নত অর্থনীতিগুলোর চাহিদা বড় ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছে আইইএ। এর পরও সরবরাহ বাড়ার হার চাহিদার প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে অনেক দ্রুত এগোচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, নানামুখী প্রভাবকের টানাপড়েনে জ্বালানি তেলের বাজার একেক সময় একেক দিকে যাচ্ছে। একদিকে রাশিয়া ও ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা থেকে সরবরাহ কমার সম্ভাবনা, অন্যদিকে ওপেক প্লাসের বাড়তি সরবরাহ ও ক্রমবর্ধমান উদ্বৃত্তের আশঙ্কা বাজারকে কোনো একদিকে স্থিতিশীল গতি অর্জন করতে দিচ্ছে না।

জ্বালানি তেলের চাহিদাসংক্রান্ত পূর্বাভাসগুলোর মধ্যে আইইএর প্রাক্কলন অন্যদের চেয়ে তুলনামূলক কমের দিকে। এর কারণ হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তরের বিষয়টিকে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। অন্যদিকে এখন পর্যন্ত ওপেকের পূর্বাভাসে বাজারে সম্ভাব্য চাহিদার পরিমাণ নিয়ে প্রাক্কলন করা হয়েছে আইইএর বেশি। গতকাল দিনের শেষভাগে প্রকাশিত ওপেকের এ-সংক্রান্ত আরেকটি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে যাচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। এর ধারাবাহিকতায় জ্বালানি তেলের চাহিদাও থাকবে ঊর্ধ্বমুখী।

আইইএর প্রতিবেদন প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে গতকাল জ্বালানি তেলের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। এ সময় পণ্যটির আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্ট কেনাবেচা হচ্ছিল প্রতি ব্যারেল ৬৮ ডলারের সামান্য কম মূল্যে।

বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি বলে দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করছে আইইএ। সংস্থাটির গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) বৈশ্বিক দৈনিক গড় মজুদ বাড়তে যাচ্ছে ২৫ লাখ ব্যারেল। আগামী বছর দৈনিক গড় চাহিদার অতিরিক্ত সরবরাহ হবে প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল। ওপেক প্লাস ও যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রাজিল ও গায়ানার মতো জোট-বহির্ভূত উত্তোলনকারী দেশগুলো থেকে এ অতিরিক্ত সরবরাহ করা হবে। যদিও চাহিদা বাড়ার পরিমাণ থাকবে সীমিত।

এর আগে গত মাসের প্রতিবেদনে ২০২৬ সালে দৈনিক গড় চাহিদার অতিরিক্ত সরবরাহের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল।

তবে বাজার পরিস্থিতি যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেছে আইইএ। সংস্থাটি বলেছে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্য ও শুল্কনীতি এবং রাশিয়া-ইরানের ওপর অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞার মতো ঘটনাবলির কারণে বাজারের ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।

আইইএ আরো জানিয়েছে, চীন এখন অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুদ বাড়িয়ে তুলছে। এ কারণে স্পট মার্কেটে এখন ব্রেন্টের দাম ফিউচার মার্কেটের চেয়ে বেশি। বিষয়টি জ্বালানি তেলের বাজারে ‘ব্যাকওয়ার্ডেশন’ হিসেবে পরিচিত, যা বাজারে ভবিষ্যৎ সংকটের ইঙ্গিতবাহী।

আরও